এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) গত মাসে এবং চলতি মাসের শুরুতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। একই পথে হেঁটেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ)। গতকাল প্রকাশিত সংস্থাটির ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এ চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৪ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বহাল থাকবে বলেও মনে করছে সংস্থাটি। এর আগে গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ।
আইএমএফের প্রতিবেদনে সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়। চলতি অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি আরো কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। তবে সংস্থাটির মতে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াবে। এর পরের দুই অর্থবছরেও যথাক্রমে ৬ দশমিক ৭ ও ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
আইএমএফের পূর্বাভাসে দেশে জেঁকে বসা উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহসাই কমার বিষয়েও আভাস মেলেনি। সংস্থাটির প্রক্ষেপণ অনুসারে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও দেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি থাকবে। এক্ষেত্রে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উঠলেও অর্থবছর শেষে এটি ৯ দশমিক ৭ শতাংশে ঠেকবে। অবশ্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এর পরের তিন অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশে থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করেছে আইএমএফ। এছাড়া আইএমএফের পূর্বাভাস অনুসারে চলতি অর্থবছরেও দেশের চলতি হিসাবে জিডিপির দেড় শতাংশ ঘাটতি থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে বিশ্বব্যাংক চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৪ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দেয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সাম্প্রতিক বন্যার কারণে সংস্থাটি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে বলে সে সময় জানায়। এর আগে গত এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এছাড়া গত মাসে এডিবি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের ৬ দশমিক ৬ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশে অবনমন করে।
প্রসঙ্গত, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সংকট কাটাতে ২০২২ সালের শেষের দিকে আইএমএফের দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশ। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের নির্বাহী বোর্ডের সভায় বাংলাদেশের জন্য ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। সাত কিস্তিতে ৪২ মাসে এ ঋণ পাবে বাংলাদেশ। ঋণের গড় সুদহার ২ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ ঋণ কর্মসূচি চলাকালীন বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের শর্ত পরিপালন ও সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬০ লাখ এবং গত বছরের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তির ৬৮ কোটি ৯৮ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ গত জুনে তৃতীয় কিস্তি বাবদ ১১৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার ছাড় করেছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে তিন কিস্তিতে ঋণের ২২৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আইএমএফের কাছে চলমান কর্মসূচির অতিরিক্ত আরো ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়ে আবেদন করেছে। গত সেপ্টেম্বরে আইএমএফের একটি মিশন বাংলাদেশ সফর করেছে। তাছাড়া ঋণের চতুর্থ কিস্তির অর্থছাড়ের আগে আগামী ডিসেম্বরে আইএমএফের একটি মিশন দেশে আসবে। বিদম্যান ঋণ কর্মসূচির শর্ত বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে নতুন করে আরো ঋণ দেয়ার বিষয়টি মূল্যায়ন করে দেখবে আইএমএফের এ মিশন।